আমরা কবে সজাগ হব?

মগবাজার চৌরাস্তা থেকে পূর্ব দিকে, ওয়্যারলেস গেট হয়ে সোজা মালিবাগ চলে গেছে রাস্তাটি। মগবাজার মোড়ে রাস্তাটির মাথায় একটু ব্যতিক্রমী একটি নামফলক। শোকের কালো রঙের এই ফলকে শান্তির সাদা অক্ষরে লেখা ‘শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক’। নামফলকটি ব্যতিক্রমী বলার কারণ, সাধারণত কালো ও সাদা রঙের ফলক ঢাকার রাস্তায় চোখে পড়ে না। মগবাজার মোড়ে দাঁড়িয়ে একজন পুলিশ কনস্টেবলকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ভাই, এই যে রাস্তাটি মৌচাকের দিকে গেছে এর নাম কী?’ কনস্টেবল সাহেব আমার দিকে কিছুটা সতর্ক দৃষ্টিতে তাকালেন। তারপর নামফলকটি দেখিয়ে বললেন, ‘ওই যে ওইখানে লেখা আছে।’ বুঝলাম এভাবে জানা হবে না। সাংবাদিক লেবাসটি ঝেড়ে ফেলতে হবে। ফুট-ওভারব্রিজ পার হয়ে চৌরাস্তার পূর্ব পাশে গিয়ে ফল কেনার বাহানায় এক ফল বিক্রেতাকে একই প্রশ্ন করলাম। তিনি জানালেন, বেশ কিছুদিন আগে সিটি করপোরেশন থেকে মাইকিং করে রাস্তাটির নাম পরিবর্তন করা হয়েছে। তবে নতুন এই নামে এখনো রাস্তাটিকে কেউ চেনে না। সবাই এখনো আউটার সার্কুলার রোড বলেই জানে। আরও একটু এগিয়ে এবার প্রশ্নটি করি এক চা বিক্রেতার কাছে। মজার ব্যাপার হলো ফল বিক্রেতার কথাটিই তিনি পুনরাবৃত্তি করলেন। রাস্তার এপারে-ওপারে আরও কিছু দোকানে প্রশ্ন করে পাওয়া গেল একই উত্তর। বুঝলাম, সবাই জানে রাস্তাটির প্রকৃত নাম। কিন্তু কেউই রাস্তার এ নাম ব্যবহার করছে না।

রাস্তার দুই ধারে অধিকাংশ দোকানের সাইনবোর্ড ও বাড়ির নম্বরপ্লেটে লেখা আউটার সার্কুলার রোড। কেউ বা আবার লিখে রেখেছে সিদ্ধেশ্বরী সার্কুলার রোড। পাশাপাশি নিউ সার্কুলার রোড নামটিও ব্যবহার করেছে কেউ কেউ। অবাক হলাম এই ভেবে, একটি রাস্তার কয়টি নাম থাকতে পারে? তবে অনেক সচেতন ব্যক্তিই ব্যবহার করেছে শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক নামটি। তেমনই একজন ‘ভাল কনফেকশনারী ও জেনারেল স্টোরের’ স্বত্বাধিকারী মো· মনিরুল আলম বাচ্চু। তিনি জানালেন, এই রাস্তার নতুন নামকরণ হয়েছে ছয় বছর হলো প্রায়। এর মধ্যে নতুন করে দোকানের সাইনবোর্ড পরিবর্তন করেছে অনেকেই। শুধু সচেতনতার অভাবেই তারা নতুন নামটি ব্যবহার করছে না এবং নতুন এই ঠিকানা ব্যবহার করায় তাঁর চিঠিপত্র আদান-প্রদান বা ব্যবসায়িক যোগাযোগ রক্ষায় কোনো সমস্যাই হচ্ছে না। একই মত পোষণ করলেন মেট্রোপলিটন হেয়ার ড্রেসিংয়ের অশোক কুমার। তাঁর সেলুনের সম্পূর্ণ সাইনবোর্ডটি পরিবর্তন করা হয়নি। তবু তিনি পুরোনো সড়কের নামটি মুছে নতুন করে লিখেছেন শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক। এমন আরও বেশ কয়টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে যারা নিজ দায়িত্ব ও সচেতনতা থেকে পরিবর্তন করেছে সড়কের নামটি। তবে এর সংখ্যা নেহাতই কম।

এ তো গেল সাধারণ ব্যবসায়ীদের কথা। কিন্তু যারা সমাজকে সচেতন ও শিক্ষিত করার দায়িত্ব নিয়েছেন, তাঁরা কতটুকু সচেতন? সিদ্ধেশ্বরী ডিগ্রি কলেজটি এই সড়কেই অবস্থিত। সেই কলেজের মূল সাইনবোর্ডে বড় বড় করে লেখা ১১৮ সিদ্ধেশ্বরী সার্কুলার রোড। এ ব্যাপারে কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো· ইয়াসিন আলমের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি জানালেন, ‘রাস্তার নাম পরিবর্তিত হলেও এভাবে ঠিকানা পরিবর্তন করা যায় না। তবে আমরা নিচে ব্র্যাকেটে ছোট করে লিখে দিতে পারি।’ এ সড়কের অপর একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নজরুল শিক্ষালয়। মাধ্যমিক এই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো· আব্দুস সালাম জানালেন, তিনি এই প্রথমবার নামটি শুনলেন! আর নিজ থেকে যদি নতুন নাম ব্যবহার করেন, তাহলে হয়তো সরকারি চিঠিপত্র আসায় সমস্যা হতে পারে এবং যদি স্কুলের কার্যনির্বাহী কমিটি থেকে প্রশ্ন করা হয়, কার নির্দেশে আপনি রাস্তার নতুন নাম ব্যবহার করছেন, তাহলে তিনি কী জবাব দেবেন? তবে শিক্ষা বোর্ড থেকে যদি নির্দেশনা দেওয়া হয়, তাহলে সড়কের নতুন নামটি ব্যবহারে তাঁদের আপত্তি নেই বলে তিনি জানান।

এসব ব্যাপার নিয়েই কথা হয় শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীনের গর্বিত সন্তান চৌধুরী মোহাম্মদ সুমন জাহিদের সঙ্গে। এই প্রতিবেদনের জন্য তথ্য সংগ্রহের দিন তিনি পরম যত্নে নতুন করে রং করছিলেন রাস্তার নামফলকগুলোয়। তাঁর কাছে জানা গেল, ১৯৭১ সালের ১৩ ডিসেম্বরের সেই ভয়ঙ্কর দুপুরের কথা, যেদিন মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করার অপরাধে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে বন্দী হন সাংবাদিক সেলিনা পারভীন। তিনি তখন শিলালিপি পত্রিকার প্রকাশক ও সম্পাদক ছিলেন। থাকতেন সে সময়কার ১১৫ নিউ সার্কুলার রোডে। শিলালিপি পত্রিকার বিক্রয়লব্ধ অর্থ দিয়েই তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের ওষুধ ও খাবার সরবরাহ করতেন। ১৩ ডিসেম্বর, ঢাকাসহ সারা দেশে কারফিউ চলছে। তখনো দুপুরে খাবার খাওয়া হয়নি সেলিনা পারভীন ও তাঁর একমাত্র সন্তান সুমন জাহিদের। বাসার সামনে এসে দাঁড়ায় একটি মাইক্রোবাস, একটি জিপ আর একটি সামরিক যান। হঠাৎ কড়া নাড়ার শব্দ। ঘরে হুড়মুড়িয়ে ঢুকে পড়ল মুখঢাকা কয়েকজন। তাদের চেনার উপায় নেই। তবে তারা কথা বলছিল বাংলায়। বলল, ‘চলেন, সচিবালয়ে যেতে হবে।’ কিছুটা অপ্রস্তুত সেলিনা পারভীন, দরজার ফাঁকে দাঁড়ানো আট বছর বয়সী সুমনকে বললেন, ‘তুমি খেয়ে নিয়ো। আমি একটু পরেই চলে আসব।’ তাঁর হাতে ছিল একটি গামছা। সেই গামছা দিয়েই চোখ বেঁধে তাঁকে নিয়ে যায় শকুনের দল।
সন্তানকে দেওয়া শেষ কথাটি রাখতে পারেননি সেলিনা পারভীন। সেদিন তিনি ফিরে আসেননি বাসায়। ফিরে আসেননি আর কোনো দিনও। তাঁকে পাওয়া যায় রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে। ক্ষতবিক্ষত শরীর, চোখ বাঁধা গামছা দিয়ে।

সেদিনের সেই শিশু সুমন আজ দুই সন্তানের জনক। কিন্তু আজও তাকে তাড়া করে ফেরে মুখঢাকা শকুনের সেই দলটি। মাকে হারানোর ্নৃতি আজও দগদগে ক্ষতের মতো জ্বালা ধরায় তাঁর বুকে। সাংবাদিক সেলিনা পারভীন জীবন দিয়েছেন দেশের জন্য। আর তাই সুমন জাহিদ গর্ব বোধ করেন তাঁর মাকে নিয়ে। তৎকালীন নিউ সার্কুলার রোড দিয়েই সেলিনা পারভীনকে ধরে নিয়ে যায় পাকিস্তানি হায়েনা ও তাদের এ দেশীয় দোসরেরা। মায়ের ্নৃতি ধরে রাখতে তাই তিনি ১৯৯৭ সালে আবেদন করেন সেলিনা পারভীনের নামে এই রাস্তার নামকরণ করার জন্য। বারবার বিভিন্ন মহলে তদবির করে অবশেষে ২০০২ সালে সফল হন তিনি। একই সালের ২০ মার্চ একটি অফিস অদেশটি জারির মাধ্যমে রাস্তাটির নাম শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক নামে ঘোষণা করে ঢাকা সিটি করপোরেশন। তবে হাস্যকর ব্যাপার হলো, এই অফিস অদেশটি শুধু রাস্তার দক্ষিণ পাশের জন্য প্রযোজ্য ছিল। যার ফলে রাস্তার উত্তর পাশের নামটি থেকে যায় অপরিবর্তিত। আবারও আবেদন করেন সুমন জাহিদ। আবারও বারংবার ধরনা দেন বিভিন্ন মহলে। অবশেষে ২০০৬ সালে ৯ এপ্রিল আরেকটি সার্কুলার জারি করে রাস্তার উভয় পাশের নাম শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক নামে ঘোষণা দেওয়া হয়। যে দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন দিয়েছেন সেলিনা পারভীন সে দেশের ছোট্ট একটি সড়কের নাম তাঁর নামে করতে সময় লেগেছে নয় বছর। কিন্তু তাতেই বা কী? আজও এ সড়কের বেশির ভাগ বাসিন্দা এ রাস্তার প্রকৃত নাম ব্যবহার করতে অস্বস্তি বোধ করেন। সবাই জানে, এ রাস্তার নাম এখন আর আউটার সার্কুলার বা নিউ সার্কুলার রোড নয়। তার পরও শহীদের নাম ব্যবহারে কেন এই আপত্তি?

কথা হয় এ এলাকার ওয়ার্ড (৫৪ নম্বর) কমিশনার শর্মিলা ইমামের সঙ্গে। তিনি জানালেন, এখন রাজনৈতিক পরিস্থিতি অস্থিতিশীল। এখনই কিছু করা সম্ভব নয়। তবে ভবিষ্যতে এলাকার মানুষকে এ ব্যাপারে সচেতন করার উদ্যোগ নেবেন তাঁরা।

১৯৭১ সালের ১০ থেকে ১৬ ডিসেম্বর। পাকিস্তানি হায়েনারা তাদের এ দেশীয় দোসর রাজাকার, আল-শামস, আল-বদরদের সহযোগিতায় ধরে নিয়ে গিয়েছিল দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের। উদ্দেশ্য ছিল, স্বাধীনতা পেলেও বাংলাদেশ যেন পঙ্গু একটি রাষ্ট্র হয়েই থাকে। তারা যেন আবারও শোষণ করতে পারে এ দেশটিকে। এ দেশের মানুষ যেন কখনোই সচেতন না হয়। দেশের জন্য জীবন দেওয়া শহীদের নামে একটি সড়কের সম্পূর্ণ নামকরণে লেগেছে নয়টি বছর। তারপর কেটেছে আরও তিন বছর। আজও মানুষ সচেতন হয়নি। আজও জাতির মেরুদণ্ড গঠনের দায়িত্বে নিয়োজিত শিক্ষক শঙ্কা বোধ করেন শহীদের নাম ব্যবহারে। মনে প্রশ্ন জাগে, পাকিস্তানি হায়েনারা কি সফল হয়েছে তাদের উদ্দেশ্যে?

আরাফাত সিদ্দিকী সোহাগ
সূত্রঃ প্রথম আলো, ডিসেম্বর ০২, ২০০৮

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *