শিশুর জন্মগত জটিলতা : চাই নবজাতক স্ক্রিনিং

একটি শিশু পরিবারের অনাবিল আনন্দের উৎস। ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর শিশু যখন চিৎকার করে আগমনবার্তা ঘোষণা করে, অবসান হয় সব উদ্বেগের। কিন্তু অনেক সময় দেখা যায়, স্নেহ-যত্নের মধ্যে প্রতিপালিত হয়েও শিশুর স্বাভাবিক বিকাশ (শারীরিক ও মানসিক) শ্লথ হচ্ছে অথবা তার বয়সের অন্য শিশুদের মতো হচ্ছে না। এ ধরনের সমস্যা কেন হয় এবং এটা প্রতিরোধের কোনো উপায় ছিল কি না, এ প্রশ্ন মা-বাবাকে আলোড়িত করে।

কী কারণে এমন হতে পারে
চিকিৎসাবিজ্ঞানে একটি বিশেষ গ্রুপের অসুস্থতা চিহ্নিত করা হয়েছে, যেগুলোকে বলা হয় কনজেনিটাল ডিজিজ বা জন্মগত অসুখ। জন্মগত পরিপাকজনিত দুর্বলতা, কোনো কোনো এনজাইমের অভাবের কারণে এ ধরনের সমস্যা হতে পারে। এসব শিশু বেশির ভাগ ক্ষেত্রে জন্মলগ্নে স্বাভাবিক থাকে, শিশুর বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে অসুস্থতার লক্ষণগুলো পরস্ফুিট হতে থাকে।

এ থেকে পরিত্রাণের কোনো পথ আছে কি
জন্মগত অসুখ নির্ণয়ের জন্য যে প্রক্রিয়া ব্যবহূত হয়, তাকে বলা হয় নবজাতকের স্ক্রিনিং। নবজাতকের রোগ শনাক্তকরণ প্রক্রিয়ার দুটি অংশ—প্রথমত, রোগ শনাক্তকরণ; দ্বিতীয়ত রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা প্রদান। রোগ শনাক্তকরণের জন্য বহুবিধ পদ্ধতি প্রচলিত আছে। কিছু রোগ আছে যেগুলো সময়মতো চিহ্নিত করে চিকিৎসা দিতে পারলে রোগাক্রান্ত শিশুটি অন্যান্য স্বাভাবিক শিশুর মতোই বেড়ে উঠবে।
নবজাতকের জন্মগত রোগ চিহ্নিত করার প্রথম উদ্ভাবক ডা. রবার্ট গুথরি একজন শিশুবিশেষজ্ঞ, ফিলটার পেপার বা চোষ কাগজে শিশুর এক ফোঁটা রক্ত সংগ্রহ করে নির্ণয় করেন ফিনাইলকিটোনোরিয়া নামে একটি জন্মগত রোগ। বর্তমান সময়ে নবজাতকের জন্মগত রোগের তালিকা মোটামুটি দীর্ঘ। প্রযুক্তি উন্নয়নের ফলে অনেক নতুন ধরনের রোগ নির্ণয়ে নানাবিধ নতুন প্রযুক্তি প্রয়োগ করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ পরিপ্রেক্ষিত
বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন পরিচালিত পারমাণবিক চিকিৎসা ইনস্টিটিউট ও আল্ট্রাসাউন্ড সেন্টার ১৯৯৯ সালে নবজাতকের মধ্যে থাইরয়েড হরমোনের স্বল্পতা নির্ণয়ের জন্য একটি প্রকল্প গ্রহণ করে। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি এজেন্সির সহায়তায় গৃহীত প্রকল্পটি বাংলাদেশে নবজাতকের জন্মগত রোগ শনাক্ত করার জন্য প্রথম পদক্ষেপ। প্রকল্প কার্যক্রমে অগ্রগতির ফলে এবং গুরুত্ব বিবেচনায় নানা পর্যায় অতিক্রম করে ২০০৬ সালে বার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনায় (এডিপি) প্রকল্পটি অন্তর্ভুক্ত হয়। চলতি বছরের ডিসেম্বর মাসে প্রকল্পের মেয়াদ পূর্ণ হবে। এই প্রকল্পের আওতায় ইতিমধ্যে দুই লাখ শিশুকে পরীক্ষা করা হয়েছে এবং ৮৬ জন শিশুকে রোগ নির্ণয় করে চিকিৎসা প্রদান করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, হাইপোথাইরয়েড বা থাইরয়েড হরমোনের অভাবজনিত রোগটি শিশুর জন্মের ছয় সপ্তাহের মধ্যে নির্ণয় করে চিকিৎসা প্রদান শুরু করা সম্ভব হলে শিশু স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠবে, অন্যথায় মস্তিষ্ক বিকাশের অভাবে শিশু শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধী হবে। প্রকল্পের উদ্যোগে রোগ নির্ণয়ের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা, যেমন—চিকিৎসা ও গবেষণাকর্মীদের প্রশিক্ষণ, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামাদি সংগ্রহ করে গবেষণাগার স্থাপন ও রক্ত সংগ্রহের জন্য অবকাঠামো তৈরি হয়েছে। তবে আলোচ্য ইস্যুটি যেহেতু শিশুস্বাস্থ্য-সম্পর্কিত, সেহেতু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত না হলে নবজাত শিশুর জন্মগত রোগ শনাক্তকরণ কর্মসূচিটি স্থায়ী হবে না। সুতরাং শিশুস্বাস্থ্য রক্ষার মানোন্নয়নের জন্য নবজাতকের হাইপোথাইরয়েড শনাক্তকরণ কর্মসূচির স্থায়ী রূপ দেওয়া প্রয়োজন।

উপসংহার
বাংলাদেশে শিশুমৃত্যুর হার এখন উদ্বেগজনক। সাম্প্রতিককালে সর্বজনীন টিকাদান পদ্ধতি প্রবর্তনের ফলে শিশুমৃত্যুর হার অনেক কমে এসেছে। কিন্তু নবজাতকের স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নের অভাবে শিশুমৃত্যুর হার এখনো উদ্বেগজনক অবস্থায় আছে। নবজাতকের স্বাস্থ্যরক্ষায় জন্মগত রোগ শনাক্তকরণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। হাইপোথাইরয়েড শনাক্তকরণের মধ্য দিয়ে নবজাতকের স্বাস্থ্য রক্ষায় নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে পারে। প্রয়োজন শুধু পরমাণু চিকিৎসা ইনস্টিটিউটের প্রকল্পটির স্থায়ী রূপ দেওয়ার জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একটি সিদ্ধান্ত। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় দ্রুত সক্রিয় ভূমিকা নিলেই হাজারো শিশুকে প্রতিবন্ধিতার অভিশাপ থেকে মুক্ত করা সম্ভব।

ফওজিয়া মোসলেম
পরমাণু চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ
সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, ডিসেম্বর ২১, ২০১১

4 comments

  1. আমি লন্ডন এ থাকি । আমি গর্ভবতী । আমি গত ১৩/১২/২০১১ এ ultrasound করাই । এতে করে আমার রিপোর্ট আসে fetus – ১/১ , heart beat – present এবং ১২.৩ সপ্তাহ ও crl – ৫৯.১৭ । আমি এখনো আমার doctor এর সাথে appointment করিনি । next appointment ১৬ থেকে ১৮ সপ্তাহর মধ্যে । আগামি জানুয়ারী মাস এ আমার appointment । আমার doctor বলেছেন ১২ সপ্তাহ হলে folic acid খাওয়া বন্ধ করতে । আমি ১২.৩ সপ্তাহে বন্ধ করেছি । আমার এর আগে একবার গর্ভপাত হয়েছিল ৮ সপ্তাহে । আমি ভুল করে cod liver oil ভিটামিন খেয়েছিলাম । তারপর আমার baby র heart beat বন্ধ হয়ে যায় । আমি এখন খুব চিন্তীতি । এখন কি আমার গর্ভপাত হবার সম্বাবনা আছে ? আর যেহেতু এখন folic acid খাওয়া বন্ধ এখন আমি কি ধরনের খাবার খাব ? এবং crl – ৫৯.১৭ এর মানে কি ? please ভালো একটা বাচ্ছার জন্য আমি কি করব । একটা উপদেশ দিন ।

    1. আপনাকে প্রথমেই দুশ্চিন্তা বন্ধ করতে হবে। একটা ব্যাপার মনে রাখবেন, আপনি খুব উন্নত একটা দেশে আছেন। নিয়মিত ডাক্তার দেখাচ্ছেন। তাই অনেক সমস্যাই আপনাকে ফেস করতে হবে না। ফলিক এসিড সাধারণত ভিটামিন বি জাতীয় খাবারে বেশী থাকে। যেমন স্পিনাচ, এসপ্যারাগাস, শালগম, ডিমের কুসুম, শিম, ডাল, কিছু সিরিয়াল, সানফ্লাওয়ার সীড, লিভার, কিডনী এবং কিছু ফলের রস। এগুলো একটু এড়িয়ে চললেই হবে। মাছ, মাংশ, দুধ, ডিমের সাদা অংশ, দই- এসব খেতে পারেন। আসলে আলাদা ভাবে ভিটামিন বি ঔষধ বাদে অন্যান্য স্বাভাবিক খাবার একটু-আধতু খেলে খুব একটা ক্ষতি হবে না। এসব নিয়ে অযথা মনের উপর চাপ বাড়াবেন না।
      CRL হলো crown to rump length, ভ্রূণের দৈর্ঘ্য পরিমাপ করে তার বয়স নির্ণয় করা হয়। ১২ সপ্তাহে এটা সাধারণত ৪১ থেকে ৫৪ মিলিমিটার পর্যন্ত লম্বা হয়ে থাকে। আপনার ১২ সপ্তাহের একটু বেশী হয়েছে বলে এটা আরেকটু বেড়েছে।
      আপনি নিয়ম করে খাবেন। যতই দিন যাবে ততই খাওয়া বাড়াতে হবে, কেননা আপনি এখন দুইজনের জন্য খাচ্ছেন। সময় মত পর্যাপ্ত ঘুমাবেন। আর মুটিয়ে যাওয়া রোধ করতে হাঁটাচলা করবেন। হালকা ব্যায়াম করবেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ- অবশ্যই দুশ্চিন্তামুক্ত থাকবেন।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *