এক সেকেন্ডের নাই ভরসা

সংগীতশিল্পী ফিরোজ সাঁই তাঁর নিজের সবচেয়ে জনপ্রিয় গানটি উৎফুল্ল জনতার সামনে ভরামঞ্চে গেয়ে মঞ্চ থেকে নামতেই ঢলে পড়লেন চিরনিদ্রায়। কাউকে এক সেকেন্ড সময় না দিয়েই রং-তামাশার এই পৃথিবী থেকে চলে গেলেন না-ফেরার দেশে। মুহূর্তের সেই দুর্ঘটনায় উপস্থিত মানুষ কিছুই করে উঠতে পারেনি। এই মৃত্যুর কারণ ছিল, ‘সাডেন কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট’। হূৎপিণ্ডের বৈদ্যুতিক স্পন্দনের সমস্যায় হার্ট বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে এই মৃত্যু হয়।

সাডেন কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট ঠিক কী অসুখ
আমাদের হূৎপিণ্ড আসলে সারা শরীরে রক্ত সরবরাহকারী একটি পাম্প। এটি চলে আমাদের শরীরের মধ্যে তৈরি এক বিশেষ জৈব-বিদ্যুতের সাহায্যে। এই বিদ্যুৎ সরবরাহে গোলযোগ দেখা দিলে অনেক সময় শুরু হয় ভেন্ট্রিকুলার ট্যাকিকার্ডিয়া। এর ফলে হার্টের ভেন্ট্রিকল বা নিলয় প্রকোষ্ঠ দুটির স্পন্দন প্রচণ্ড বেড়ে গিয়ে মিনিটে প্রায় চার শ হয়ে যায়। এরপর হূৎস্পন্দন কমে আসে। এতটাই কমে যে এই হার হূদ্যন্ত্র আর রক্ত সরবরাহ করতে পারে না। এ অবস্থাকে বলে ভেন্ট্রিকুলার ফিব্রিলেশন ।

সাডেন কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট কাদের হতে পারে
সাধারণত চারটি ক্ষেত্রে দেখা যায়, যাঁরা এসসিএতে একবার আক্রান্ত হয়েছেন; যাঁদের হার্টের রক্ত পাম্প করার ক্ষমতা সাধারণত কম; যেসব হূদেরাগী বিভিন্ন ভালভের রোগ, ডায়ালেটেড ও হাইপারট্রপিক কার্ডিওমায়োপ্যাথি-জাতীয় হার্টের গঠনগত ত্রুটি আছে; যাঁদের একবার হার্ট অ্যাটাক হয়েছে, তাঁদেরও এসসিএ হতে পারে।

কী চিকিৎসা
এসসিএ প্রতিরোধ বা সতর্কতামূলক চিকিৎসাকে সাধারণত মেডিকেল থেরাপি ও আইসিডির সাহায্যে প্রতিরোধ—এই দুই ভাগে ভাগ করতে পারি। কোনো হূদেরাগীর এসসিএ ধরা পড়লে প্রথমে তাঁকে মেডিকেল থেরাপি দেওয়া হয় বা ওষুধের সাহায্যে চিকিৎসা করা হয়। কিন্তু যেকোনো ওষুধই প্রতিরোধে আংশিক কার্যকর। এসসিএকে সম্পূর্ণ দূর করতে হলে রোগীর শরীরে আইসিডি বা ইমপ্ল্যান্টঅ্যাবল কার্ডিওভার্টার ডিফিব্রিলেটর নামের যন্ত্র বসাতে হয়। অত্যন্ত শক্তিশালী ও কার্যকর এই যন্ত্রটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সব সময় রোগীর হূৎস্পন্দনকে মনিটরিং করে। প্রয়োজনে হাসপাতালের মতো শক দিয়ে বন্ধ হওয়া হূৎপিণ্ড সচল করে।

আইসিডি কতটা প্রয়োজনীয়
আইসিডির সাফল্য প্রায় ৯৯ শতাংশ। অর্থাৎ প্রায় সব ক্ষেত্রেই আইসিডি এসসিএকে সম্পূর্ণ ও স্থায়ীভাবে প্রতিরোধ করে। সে জন্য বর্তমানে প্রতিবছর সারা পৃথিবীতে প্রায় তিন লাখ মানুষের শরীরে আইসিডি বসানো হয়।

পরিশেষে
আমাদের দেশে অনেক রোগী হার্ট অ্যাটাকের পর হূৎপিণ্ডে স্টেন্ট বসানো বা সফল বাইপাস সার্জারির পরও এসসিএর শিকার হচ্ছেন। হঠাৎ হূৎস্পন্দন বন্ধ হয়ে মৃত্যু প্রতিরোধে আইসিডিই একমাত্র স্থায়ী ও নির্ভরযোগ্য সমাধান। আইসিডি প্রতিস্থাপনের পর একজন লোক তাঁর সাধারণ ও স্বাভাবিক জীবন কাটাতে পারেন। তবে তাঁকে সব সময়ই চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে থাকতে হয় ও নিয়মিত রুটিন চেকআপ করাতে হয়।

এম আতাহার আলী
হূদেরাগ বিশেষজ্ঞ এবং ইলেকট্রো ফিজিওলজিস্ট
জাতীয় হূদেরাগ ইনস্টিটিউট।
সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, আগস্ট ২৪, ২০১১

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *