গবেষক ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা বলেছেন, সোয়াইন ফ্লুতে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। সাধারণ মৌসুমি ইনফ্লুয়েঞ্জার (ফ্লু) মতোই সর্দি, জ্বর বা কাশি হয় সোয়াইন ফ্লু হলে। এর চিকিৎসা দেশে আছে।
রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, দুটো কারণে সোয়াইন ফ্লুতে ভয়ের কারণ নেই। প্রথমত, এই রোগের পর্যাপ্ত ওষুধ ও প্রশিক্ষিত চিকিৎসক দেশে আছে। দ্বিতীয়ত, সোয়াইন ফ্লু ভাইরাস প্রতিরোধ করার অ্যান্টিবডি বা প্রাকৃতিক ক্ষমতা এ দেশের মানুষ অর্জন করেছে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) মেডিসিন অনুষদের ডিন ও বিশিষ্ট চিকিৎসক এ বি এম আব্দুল্লাহও অভয় দিয়ে বলেন, ‘বছর তিনেক আগে সোয়াইন ফ্লু প্রথম শনাক্ত হওয়ার সময়ই বলেছিলাম, ওষুধ কোম্পানি ও চিকিৎসা সরঞ্জাম (বিশেষ করে মাস্ক) প্রস্তুতকারীরা আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। সাধারণ স্বাস্থ্যবিধি মানলেই সোয়াইন ফ্লু থেকে দূরে থাকা যায়।’
এই দুই বিশেষজ্ঞ বলেন, হাঁচি, কাশি, থুতু ও কফের মাধ্যমে মানুষ থেকে মানুষে এই রোগের ভাইরাস ছড়ায়। তাই খাওয়ার আগে এবং হাঁচি বা কাশি দেওয়ার পর ভালো করে হাত ধুতে হবে।
মানুষ, পাখি ও শূকর আক্রান্ত হয়—এমন পৃথক তিন ধরনের ভাইরাসের সংমিশ্রণে তৈরি হওয়া নতুন একটি ভাইরাস ২০০৯ সালে প্রথম শনাক্ত হয়। মানুষ থেকে মানুষে এই নতুন ভাইরাসের সংক্রমণ হতে থাকে। এ থেকে সৃষ্ট রোগ সাধারণভাবে সোয়াইন ফ্লু নামে পরিচিতি পায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এর নাম দেয় ‘প্যানডেমিক ভাইরাস এইচ১এন১ ২০০৯’। এই ভাইরাস তখন প্রাণঘাতী ছিল। কারণ, মানুষের শরীরে একে প্রতিরোধ করার প্রাকৃতিক ক্ষমতা ছিল না।
আইইডিসিআরের পরিচালক মাহমুদুর রহমান বলেন, ২০০৯ সালে সারা বিশ্বে এইচ১এন১ ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ায় বাংলাদেশেও বহু মানুষ এতে আক্রান্ত হয়। এর পর থেকে প্রাকৃতিকভাবেই এই ভাইরাসের প্রতিরোধ ক্ষমতা এ দেশের মানুষ অর্জন করে।
তবে এ ক্ষেত্রে ভিন্নমত পোষণ করেছেন ভাইরাস বিশেষজ্ঞ ও বিএসএমএমইউর সাবেক উপাচার্য মো. নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন, বাংলাদেশে কত মানুষ ২০০৯ সালে সোয়াইন ফ্লুতে আক্রান্ত হয়েছিল, তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই। এ দেশের মানুষের শরীরে এইচ১এন১ ভাইরাসের অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে কি না, তার বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্য দরকার।
রোগনিয়ন্ত্রণ ও রোগতত্ত্ব গবেষণা বিষয়ে দেশের শীর্ষ প্রতিষ্ঠান আইইডিসিআর রোগের প্রাদুর্ভাবের বিষয়টি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করে। প্রতিষ্ঠানটি বলছে, তাদের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, সাধারণ মৌসুমি ফ্লুর (এইচ৩এন২) জায়গা দখল করে নিচ্ছে ‘সোয়াইন ফ্লু’ বা এইচ১এন১ ভাইরাস। ২০১০ সালেও এ দেশে এইচ১এন১ ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব হয়েছিল।
মাহমুদুর রহমান বলেন, বাংলাদেশে ফ্লুর মৌসুম এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর। কিন্তু এ বছর জানুয়ারি থেকে এইচ১এন১ ভাইরাসের প্রকোপ দেখা গেছে। এই ভাইরাসে সংক্রমণের হারও অনেক বেশি।
কুড়িগ্রামের নার্সিং ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীরা এ মাসে সোয়াইন ফ্লু ভাইরাসে আক্রান্ত হন। মাহমুদুর রহমান বলেন, তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ইনস্টিটিউটের যেসব কক্ষে বেশি ছাত্রী গাদাগাদি করে থাকেন, সেসব কক্ষে সংক্রমণের হার বেশি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সোয়াইন ফ্লু ও মৌসুমি ফ্লুর উপসর্গ একই। চিকিৎসাও এক। তবে ক্যানসার বা বহুমূত্র (ডায়াবেটিস) রোগী এবং গর্ভবতী নারী সোয়াইন ফ্লুতে আক্রান্ত হলে বাড়তি মনোযোগ দিতে হবে।

শিশির মোড়ল
সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, এপ্রিল ২১, ২০১২