হূৎস্বাস্থ্য নিয়ে সম্প্রতি কথা বলেছেন ব্যানার চার্চিল কমিউনিটি হাসপাতালের ফ্যামিলি মেডিসিন ফিজিশিয়ান চিকিৎসক এরিক হার্জোগ।
জানতে হবে হূৎস্বাস্থ্যের ঝুঁকিগুলো এবং করতে হবে প্রতিরোধ।

তিনটি বড় ঝুঁকি
অনেকে প্রাচীন বাক্য ‘প্রতিরোধই শ্রেষ্ঠ ওষুধ’—এতে তেমন বিশ্বাস করেন না। তাঁদের জন্য বলি, নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা, এমনকি প্রতিরোধ করা ও হূদরোগের তিনটি বড় ঝুঁকি মোকাবিলার বিষয়টি নিজের হাতে।
সেই তিনটি বড় ঝুঁকি হলো ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ ও রক্তের উচ্চমান কোলেস্টেরল।
এর যেকোনো একটি ঝুঁকি থাকলে হূদরোগ হওয়ার আশঙ্কা বাড়ে তো বটেই; আরও বড় কথা, যাঁদের মধ্যে এর একটি ঝুঁকি থাকে, তাঁদের আরও ঝুঁকির আশঙ্কা থাকে। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের হার্ট ডিজিজ প্রিভেনশন প্রোগ্রামের একটি সাম্প্রতিক গবেষণা থেকে জানা যায়, যাঁদের মধ্যে এই তিনটি ঝুঁকি থাকে, তাঁদের করোনারি হূদরোগে মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ে ৬৫ শতাংশ। সৌভাগ্যবশত আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের কল্যাণে ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ ও উচ্চমানের কোলেস্টেরলের রয়েছে অত্যন্ত ফলপ্রসূ চিকিৎসা।
এসব সমস্যা মোকাবিলা, এগুলো নিয়ন্ত্রণের বা প্রতিরোধের পদক্ষেপ নিলে আর ভালো কী হতে পারে? কেনই বা যাঁদের একটি ঝুঁকি থাকে, তাঁদের মধ্যে আরও দুটো ঝুঁকিও এসে যায় ক্রমান্বয়ে। গবেষকেরা এই ঝুঁকির সম্মিলন দেখেছেন, সঙ্গে এ তিনটি ঝুঁকিও—একই সঙ্গে এতগুলো ঝুঁকি কারও মধ্যে থাকলে একে বলা যেতে পারে ‘মেটাবলিক সিনড্রোম’। আরও দেখেছেন, যাঁদের মেটাবলিক সিনড্রোম রয়েছে, এর অন্তর্গত সমস্যা হলো ‘ইনসুলিন রেসিস্ট্যান্স’। সহজ কথায়, এমন হলে শরীর সঠিকভাবে ইনসুলিন গ্রহণ করতে পারে না। ইনসুলিন-ক্ষরণে ঘটে ব্যাঘাত, ঘটতে পারে টাইপ-২ ডায়াবেটিসসহ উচ্চরক্তচাপ, উচ্চমান কোলেস্টেরল ও অন্যান্য সমস্যা। শরীর ভারী হলে বা স্থূল হলে ইনসুলিন রেসিস্ট্যান্স হওয়ার আশঙ্কা থাকে বেশি। জিনগত প্রভাবের চেয়েও মূলত অনেক জোরালো প্রভাব ফেলে শরীরের ওপর। আমেরিকায় ৬৪ শতাংশ জনগোষ্ঠী স্থূল। আমাদের দেশেও স্থূল লোকের সংখ্যা বাড়ছে। ওজন বেশি হলে ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ, উচ্চমান কোলেস্টেরল সবই বেড়ে যায়। মানুষের ওজন যত বেশি হয়, ইনসুলিন রেসিস্ট্যান্সের আশঙ্কাও বাড়ে। তখন বাড়তি ওজন শরীর থেকে ঝেড়ে ফেলা বড় কঠিন হয়ে পড়ে। এ এক অন্ধকার, যা থেকে বেরিয়ে আসা দুরূহ। তবে এ জন্য চাই চেষ্টা ও অঙ্গীকার। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে না থাকলে হূদরোগ ও রক্তনালীর রোগ হতে পারে। হার্টে যে ধমনীগুলো রক্ত নিয়ে যায়, সেগুলো সরু হয়ে যেতে পারে। বড় বড় রক্তনালীর রোগ হতে পারে, রক্তনালীর পথ বন্ধ হতে পারে। শেষ পর্যন্ত যা হয় তা হলো, হার্টকে নিজের কাজ সম্পন্ন করার জন্য কঠোর পরিশ্রম করতে হয়।
রক্তে ক্ষতিকর কোলেস্টেরল ‘এলডিএল’ বেশি থাকলেও এমন হয়। রক্তনালীর পথ সরু হয়ে যায়। উচ্চরক্তচাপ হূদযন্ত্রকে প্রসারিত করে, দুর্বল করে। হার্ট ও রক্তনালী দুটোই ক্ষতির এবং আঘাতের মুখোমুখি হয়।

এভাবে বসে থাকা সমীচীন নয়
নিজের স্বাস্থ্যের দেখভাল করার মধ্য দিয়ে প্রত্যয় গড়ে ওঠে। কেন উচ্চপ্রযুক্তির দ্বারস্থ হওয়া। মা-দাদিদের কথা শোনা ভালো।

কম খান, বেশি দিন বাঁচুন
তবে একটা কথা ঠিক, ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ ও কোলেস্টেরল প্রতিরোধে সজাগ, সতর্ক থাকার জন্য জনগণকে উদ্বুদ্ধ করা বেশ কঠিন কাজ। কারণ, এসব সমস্যা থেকে উপসর্গ দেখা যায় না অনেক দিন, আর বিপজ্জনক পর্যায়ে না পৌঁছানো পর্যন্ত লক্ষণ, উপসর্গ প্রায়ই দেখা যায় না। এরিক হার্জোগ বলেন, ইনসুলিন রেসিস্ট্যান্সকে পরাস্ত করার বড় হাতিয়ার হলো জীবনধারায় পরিবর্তন ও সঠিক খাদ্যাভ্যাস। এতে কমে উচ্চরক্তচাপ, কমে কোলেস্টেরল ও নিয়ন্ত্রণে আসে রক্তের সুগার। সঠিক খাদ্য, নিয়মিত ব্যায়াম করলে ডায়াবেটিস, কোলেস্টেরল ও উচ্চরক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে। এমনকি ক্যানসারের মতো সমস্যাও দূরে থাকে। রোগ প্রতিরোধে ‘ব্যায়াম’ হলো জাদু, বুলেটের মতো। আর সঠিক খাদ্যের মধ্যে যে শক্তি থাকে, একে আহরণ করলে আমরা অনেক ক্রনিক রোগই মোকাবিলা করতে পারব। এগুলো থেকে আমরা রক্ষাও পেতে পারি।

অধ্যাপক শুভাগত চৌধুরীর কলম থেকে
সাবলীল থাকুক হৃত্স্বাস্থ্য পরিচালক, ল্যাবরেটরি সার্ভিসেস, বারডেম হাসপাতাল
সাম্মানিক অধ্যাপক, ইব্রাহিম মেডিকেল কলেজ, ঢাকা।
সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, মার্চ ০৩, ২০১০