নগরে গাছের মেলা

তিন বছরের অর্পণ বাবার কোল থেকে নেমেই দে ছুট। ভেবেছিল হারিয়ে যাবে আজ; জামরুল, লিচুসহ নাম না জানা বনের ভেতর। মেহজাবিন চৌধুরী এসেছেন মানিকগঞ্জ থেকে, তাঁর প্রিয় কিছু ফুলের সঙ্গে মিতালি করতে। অনেক শিক্ষার্থীও আসছেন বইতে পড়া গাছগুলো আরও কাছ থেকে চিনে নিতে। এ রকম আরও হাজার মানুষ এসেছে, ঢাকার শেরেবাংলা নগরের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার মাঠে। ইটকাঠের এই ঢাকায় সবুজ পরিবেশ তৈরি করে দিয়েছে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়। তাদের আয়োজনে প্রতিবছরের মতো এবারও শুরু হয়েছে ‘জাতীয় বৃক্ষমেলা ২০১০’। ‘সবুজ নগর সবুজ দেশ, বদলে দেবে বাংলাদেশ’ স্লোগান নিয়ে ১ জুন থেকে শুরু হওয়া এই বৃক্ষমেলা চলবে ৩০ জুন পর্যন্ত। তথ্যকেন্দ্র থেকে জানা যায়, এবার মেলায় ১৫০টি স্টল রয়েছে। তার মধ্যে সরকারি ১৬টি, বাকি স্টলগুলো বেসরকারি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন। সকাল নয়টায় শুরু হয়ে মেলা শেষ হয় প্রতিদিন রাত নয়টায়। আয়োজকেরা আরও জানান, এ বছর শুরু থেকেই লোক সমাগম বেশি থাকায় বিক্রিও হচ্ছে অনেক ভালো। বিক্রেতারা জানালেন, ফল ধরা গাছ বেশি বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া ফলসহ শোভাবর্ধন গাছও বিক্রি হচ্ছে ভালো। কিছু স্টলে উন্নত ফলনের কলাকৌশল ও গবেষণা প্রকল্প প্রদর্শিত হচ্ছে। বিক্রি হচ্ছে মৃৎশিল্প। মেলায় প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্য নির্বাচনে সুন্দরবনের পক্ষে ভোট গ্রহণ চলছে। বিভিন্ন ধরনের বনসাই, পামবীজ, বনায়ন মডেল সহজে দর্শকদের আকর্ষণ বাড়াচ্ছে। চলুন, এবার মেলায় পাওয়া যায় এমন কিছু গাছের নাম জানা যাক।

ফলদ
আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু, সফেদা, জলপাই, বাউকুল, জাম্বুরা, লেবু, ডালিম, পেয়ারা, আমড়া, কামরাঙা, করমচা, লটকন, আঙুর, জামরুল, তেঁতুল, মালটা, কদবেল, শরিফা, আতা প্রভৃতি।

বনজ
জারুল, দেবদারু, মেহগনি, আকাশমণি, শিশু, গামারি, গর্জন, চাপালিশ, বট, পাকুড় প্রভৃতি।

ঔষধি
অশোক, আমলকী, অর্জুন, নিম, ডুমুর, বহেড়া, হরীতকী, কালোমেঘ, নিসিন্দা, ঘৃতকুমারী, পাথরকুচি, অনন্তমূল, পুদিনা, দুধরাজ, শতমূলী থানকুনি প্রভৃতি।

ফুল
বিভিন্ন জাতের গোলাপ, বেলি, হাসনাহেনা, টগর, শাপলা, পদ্ম, জবা, চন্দ্রমল্লিকা, গন্ধরাজ, রজনীগন্ধা, রঙ্গন, উইপিং এজোনিয়া, দোলনচাঁপা, মনিরাজ, স্টার, সিলভিয়া, বাগানবিলাস, নাইটকুইন, কসমস, দোপাটি, শিবলিঙ্গম, শতমূলী, পাতাবাহার ইত্যাদি।

অর্কিড ও ক্যাকটাস
ফ্রানমক্সি, ভেন্ডা, অনসিডাম, ডেনড্রোরিয়াম, এসকড, পেপোনডিলাম। এ ছাড়া ক্যাকটাসের মধ্যে নুটো, সমসকাট, ক্যালিয়াস, রুবি, চেনি, ফিশহুক, ওভানসিয়া, জিমুনসহ আরও নানা প্রজাতি।
এ ছাড়া আছে কিছু বিশেষ গাছ, যেমন চিনিপাতা, এয়ারকন্ডিশন, সাইকাস, মরিচ, বেগুন, ঘেঁটকচু, ভাংলি, চীনা ঘাস, পাম ট্রি, ক্রিসমাস ট্রি, তোকমা, মসলাজাতীয় গাছ।
এখানে শুধু যে গাছ আছে, তা নয়, আছে কীভাবে গাছের পরিচর্যা করা যাবে—এমন অনেক বই, আছে গাছের কীটপতঙ্গ দমনের জন্য কীটনাশক, আছে ছোট কচ্ছপ, মজার মজার আচার, মৃৎশিল্প যেমন ফুলের টব, বাঁশের ঝুড়ি, কাটা বাঁশসহ গাছ ঝুলিয়ে রাখার সরঞ্জাম।

দরদাম
এখানে চারাগাছের দাম পাঁচ থেকে ২০০ টাকার মধ্যে। ক্যাকটাসজাতীয় গাছ ২০ টাকা থেকে দুই হাজার, ৮০ হাজার টাকার মধ্য বনসাই উদ্ভিদ। এ ছাড়া দরদাম করে কিনে নিতে পারেন আপনার পছন্দের গাছটি। মেলায় প্রবেশমূল্য নেই। আপনার লাগানো গাছটি হয়তো একটু হলেও জলবায়ু প্রতিরোধে ভূমিকা রাখবে। সবুজ করে তুলবে প্রিয় বাংলাদেশ। ব্যস্ততাকে পাশ কাটিয়ে একবার হলেও ঘুরে যেতে পারেন সবুজের এ মেলা থেকে। নিয়ে যেতে পারেন একটু মুক্ত বায়ু।

সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, জুন ১৫, ২০১০

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *