ঘটনা: এক দম্পতি ১৬ বছর ধরে বিবাহিত জীবন যাপন করছেন। স্ত্রীকে নিয়ে এসেছেন চেকআপের জন্য। তিনি জানেন, তাঁর স্ত্রী থ্যালাসেমিয়ার রোগী। স্বামীকে স্ত্রীর প্রতি বেশ যত্নবান মনে হলো। আমাদের দেশে এ অসুখ কখনো ভালো হবে না, তা জেনেও স্ত্রীর প্রতি যে স্বামী এতখানি যত্নবান, তাঁকে কি ভালো না বলে পারা যায়? কিছুদিন পর স্ত্রী আবার এলেন, একা। তাঁর কাগজপত্র দেখছি, এমন সময় তাকিয়ে দেখি, তিনি ঝরঝর করে কাঁদছেন। কিছু জিজ্ঞেস করতে হলো না। নিজ থেকেই বলে গেলেন, তাঁর স্বামী আবার বিয়ে করতে চান। কারণ, এটা নাকি ক্যানসার। সে জন্য এত ঘন ঘন রক্ত দিতে হয়। এই মধ্যবয়সে এসে ছেলেমেয়ে নিয়ে তিনি কোথায় যাবেন—এই বলে আবারও কান্না শুরু করলেন। এ কান্নার শেষ কোথায় আমরা জানি না। থ্যালাসেমিয়া আসলে একটি বংশগত রোগ।

০ এটা কোনো ছোঁয়াচে বা সংক্রামক রোগ নয়। একজনের কাছ থেকে অন্যজনের মধ্যে বাতাস, পানি বা হাঁচি-কাশির মাধ্যমে ছড়ায় না।
০ ত্রুটিপূর্ণ হিমোগ্লোবিন বহন করা দোষের কিছু নয়। এতে লজ্জিত বা হীনম্মন্যতায় ভোগার কিছু নেই।
০ বিবাহিত জীবনে আপনার সঙ্গীর যদি ত্রুটিপূর্ণ হিমোগ্লোবিন না থাকে, তাহলে মোটামুটিভাবে আপনি বিপদমুক্ত। আপনার সন্তান এ রোগের বাহক হবে কিন্তু স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারবে।

আমাদের দেশে বিটা থ্যালাসেমিয়া ও হিমোগ্লোবিন ই-ডিজঅর্ডার বেশি।
বিশ্ব থ্যালাসেমিয়া দিবস পালিত: ৮ মে বিশ্ব থ্যালাসেমিয়া দিবস হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে সারা বিশ্বে পালিত হয়। আমাদের দেশও এ থেকে ব্যতিক্রম নয়। বহু আলোচনার মধ্য দিয়ে দিবসটি এবারও পালিত হলো অন্যান্য বছরের মতোই।

থ্যালাসেমিয়া বংশগত রক্তরোগ থ্যালাসেমিয়া হচ্ছে বংশগত রক্তস্বল্পতা রোগ, যা কিনা রক্তের মধ্যে ত্রুটিযুক্ত হিমোগ্লোবিনের জন্য হয়ে থাকে। স্বাভাবিক মানুষের রক্তে হিমোগ্লোবিন সাধারণত দুটি আলফা ও দুটি বিটা চেইন বহন করে। এই দুটি চেইনের যেকোনো একটি পরিমাণে কম থাকতে পারে অথবা পরিমাণ ঠিকই আছে; কিন্তু গঠন-প্রক্রিয়ায় কিছু ত্রুটি থাকে। যাদের হিমোগ্লোবিনে (রক্তের লাল অংশ) আলফা অথবা বিটা চেইন পরিমাণে কম থাকে, তাদের বলা হয় আলফা অথবা বিটা থ্যালাসেমিয়া। ত্রুটিযুক্ত হিমোগ্লোবিন, যেমন—হিমোগ্লোবিন ‘ই’, ‘বি’ ও ‘এস’ ইত্যাদি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, সারা বিশ্বে প্রায় ১০ কোটির বেশি লোক বিভিন্ন ধরনের বিটা থ্যালাসেমিয়ার জিন বহন করে। ফলে প্রতিবছর প্রায় এক লাখ শিশুর জন্ম হচ্ছে জটিল থ্যালাসেমিয়া রোগ নিয়ে।

আজ পর্যন্ত বাংলাদেশে থ্যালাসেমিয়া রোগীর সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবমতে, বাংলাদেশে তিন শতাংশ লোক বিটা থ্যালাসেমিয়ার বাহক, চার শতাংশ অন্যান্য ত্রুটিপূর্ণ হিমোগ্লোবিন রোগের বাহক।

অতএব দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার সাত শতাংশ লোক এ রোগে আক্রান্ত।

আমাদের করণীয়:
 নিয়মিত রক্ত পরীক্ষা করানো।
 রক্তে হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ ১০ গ্রাম বা ডেসিলিটার রাখার চেষ্টা করতে হবে।
 হেপাটাইটিস-বি ভাইরাসের টিকা নেওয়া।
 শিশুরোগীর ক্ষেত্রে প্রতি তিন মাস অন্তর উচ্চতা, ওজন, লিভার ফাংশন টেস্ট করাতে হবে।
 আট থেকে ১০ ব্যাগ রক্ত দেওয়ার পর রক্তে লৌহের পরিমাণ নির্ণয় করতে হবে।
 রক্তে লৌহের মাত্রা এক হাজার ন্যানো গ্রাম বা মিলি লিটারের ওপরে হলে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া।
 বিশুদ্ধ রক্ত পরিসঞ্চালন করা।
 শিশুর প্রতিবছর বুদ্ধি ও বিকাশ পর্যবেক্ষণ করা।

আরও যা করণীয়: নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে থেকে এ রোগ থেকে মুক্ত ভেবে আত্মতৃপ্তি লাভের কোনো সুযোগ নেই। কেননা বৈবাহিক সূত্রে হয়তো আপনার ছেলের বউ অথবা মেয়ের জামাইও হতে পারে এ রোগের বাহক। তাহলেই তো আপনার বংশে ঢুকে গেল থ্যালাসেমিয়া।
এ রোগ প্রতিরোধের কোনো বিকল্প নেই, তাই চলুন—
 সমাজে সচেতনতা সৃষ্টি বাড়াতে প্রচারের সাহায্য নিই টেলিভিশন বা পত্রিকার মাধ্যমে।
 বিনা মূল্যে সরকারি হাসপাতালগুলোয় রোগ নিরীক্ষণের ব্যবস্থা করি।
 বংশবিষয়ক পরামর্শকেন্দ্র স্থাপন।
 গর্ভাবস্থায় রোগ নির্ণয় নিশ্চিতকরণ।

৮ মে দিবসটি উদ্যাপন প্রতিবছরের মতো দিবসকেন্দ্রিক হয়ে গেছে। বাংলাদেশে প্রায় ৯২ লাখ রোগীর জন্য নতুন কিছু শোনাতে পারি না। এ রোগটি একেবারে নির্মূল করতে জেনেটিক কাউনসেলিংয়ের কোনো বিকল্প নেই। আমাদের দেশে এই বিশাল সংখ্যার রোগীর যদি আর বৃদ্ধি না চাই, তাহলে এখনই আইন করে আন্ত-থ্যালাসেমিক পরিবারে বিয়ে বন্ধ করতে হবে।

 বিয়ের আগে অবশ্যই হিমোগ্লোবিন ইলেকট্রো ফোরেসিস রিপোর্ট নিয়ে নিবন্ধন করার সময় জমা দিতে হবে।
 ত্রুটিপূর্ণ হিমোগ্লোবিনের বাহকদের মধ্যে বিয়ে বন্ধ করতে হবে বা বিয়ে করলেও তাঁরা সন্তান নিতে পারবেন না।
আমাদের দেশে থ্যালাসেমিয়া রোগীর চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধই সহজ।

মাসুদা বেগম
সহযোগী অধ্যাপক, হেমাটোলজি বিভাগ
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়
সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, মে ১১, ২০১১