ডেঙ্গুজ্বর: বিভ্রান্তি ও করণীয়

বাংলাদেশে ডেঙ্গুজ্বরের প্রাদুর্ভাব অনেক আগে থেকে। প্রায় প্রতি বর্ষাতেই কমবেশি ডেঙ্গুজ্বর হয়ে থাকে। কিন্তু গত শতাব্দীর শেষভাগে হঠাৎ ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়ে গেলে তা সবার নজরে আসে। গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা আর দ্রুত কিছু মৃত্যু সাধারণ জনগণের মনে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। অবশ্য গত ১০-১২ বছরে অবস্থার উন্নতি হয়েছে। একদিকে চিকিৎসকদের যেমন অভিজ্ঞতা ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসার দক্ষতা বেড়েছে, তেমনি রোগী ও জনসাধারণের সচেতনতা বাড়ায় ডেঙ্গুজ্বর নিয়ে ভীতিকর অবস্থারও অনেক পরিবর্তন হয়েছে।

ডেঙ্গুজ্বরে কি মুত্যুর ঝুঁকি রয়েছে?
অনেকে এখনো মনে করেন, ডেঙ্গুজ্বর মাত্রই খুব মারাত্মক রোগ এবং এতে প্রায়ই রোগী মারা যায়। এ ধারণা একেবারেই ভুল। সঠিকভাবে চিকিৎসা করা হলে সাধারণ ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত প্রায় শতভাগ রোগীই ভালো হয়ে যায়। যদিও বলা হয়, ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভারে মৃত্যুহার ৫ থেকে ১০ শতাংশ, কিন্তু বাস্তবে নিজ অভিজ্ঞতায় দেখেছি যে এ হার ১ শতাংশের নিচে। তাই ডেঙ্গু নিয়ে অযথা ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই।

জ্বর কমে গেলে কি সব বিপদ কেটে গেল?
ডেঙ্গুতে জ্বর সাধারণত পাঁচ থেকে ছয় দিন থাকে এবং তারপর সম্পূর্ণ ভালো হয়ে যায়। তবে কখনো কখনো দুই বা তিন দিন পর আবার জ্বর আসতে পারে। জ্বর কমে গেলে বা ভালো হয়ে গেলে অনেক রোগী, এমনকি অনেক চিকিৎসকও মনে করেন যে রোগ সম্পূর্ণ ভালো হয়ে গেছে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, ডেঙ্গুজ্বরে মারাত্মক সমস্যা হওয়ার সময় আসলে এটাই। এ সময় প্লাটিলেট কাউন্ট কমে যায় এবং রক্তক্ষরণসহ নানা রকম সমস্যা দেখা দিতে পারে। জ্বর কমে যাওয়ার পরবর্তী কিছুদিনকে তাই বলা হয় ক্রিটিক্যাল পিরিয়ড। এ সময়টাতে সবারই সচেতন থাকা অত্যন্ত জরুরি।

মা ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত অবস্থায় বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়াবেন কি?
ডেঙ্গুজ্বর ভাইরাসবাহিত, মশার কামড়ের মাধ্যমে হয়ে থাকে। মায়ের বুকের দুধে এই ভাইরাস থাকে না। কাজেই আক্রান্ত অবস্থায় মা বাচ্চাকে তাঁর বুকের দুধ খাওয়াতে পারবেন। এ নিয়ে বিভ্রান্তির কোনো অবকাশ নেই।

ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত ব্যক্তির সঙ্গে একত্রে থাকা যাবে কি?
ডেঙ্গু কোনো ছোঁয়াচে রোগ নয়। কাজেই ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত ব্যক্তির সঙ্গে এক বিছানায় শোয়া, একসঙ্গে থাকা-খাওয়া বা রোগীর ব্যবহার্য কোনো জিনিস ব্যবহার করায় কোনো বাধা নেই।

ডেঙ্গুজ্বরে কী কী পরীক্ষা কখন করা উচিত? প্লাটিলেট কাউন্ট ও অ্যান্টিবডি পরীক্ষার ভূমিকা কী?
জ্বরের শুরুতে বা দু-এক দিনের জ্বরে রক্ত পরীক্ষায় কোনো কিছু শনাক্ত না-ও হতে পারে এবং তা রোগ নির্ণয়ে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করতে পারে। রোগী, এমনকি চিকিৎসকও মনে করতে পারেন যে রিপোর্ট ভালো আছে। তাই আর কোনো পরীক্ষার প্রয়োজন নেই। মনে রাখতে হবে যে প্লাটিলেট কাউন্ট চার বা পাঁচ দিন পর কমতে শুরু করে। তাই জ্বর শুরুর পাঁচ বা ছয় দিন পর রক্ত পরীক্ষা করা উচিত। এর আগে পরীক্ষা করলে তা স্বাভাবিক থাকে বলে রোগ নির্ণয়ে যেমন বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়, তেমনি অপ্রয়োজনে পয়সা নষ্ট হয়।
অনেকেই দিনে দু-তিনবার প্লাটিলেট কাউন্ট করে থাকেন। আসলে প্লাটিলেট কাউন্ট ঘন ঘন করার প্রয়োজন নেই। দিনে একবার করাই যথেষ্ট, এমনকি মারাত্মক ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভারেও।

ডেঙ্গুজ্বরে আর কী কী পরীক্ষা করতে হবে?
সব রোগীর ক্ষেত্রেই ব্লাড সুগার পরীক্ষা করা উচিত। ডেঙ্গুতে সাময়িকভাবে ব্লাড সুগার বেড়ে যেতে পারে। এ ছাড়া ডেঙ্গুতে কিছু রুটিন পরীক্ষা করা হয়, যা অপরিহার্য নয় এবং সব ক্ষেত্রে করা হয় না, কিছু সুনির্দিষ্ট ক্ষেত্রেই করা উচিত। ডেঙ্গুতে সাধারণত লিভারের প্রদাহ (হেপাটাইটিস) হয়ে থাকে, যার কারণে রক্তে লিভারের পরীক্ষাসমূহ স্বাভাবিক না-ও হতে পারে। যেমন—এসজিপিটি, এসজিওটি, এলকালাইন ফসফাটেজ ইত্যাদি বাড়তে পারে।
তাই ডেঙ্গুজ্বর শনাক্ত হয়ে গেলে লিভারের জন্য এই পরীক্ষাগুলো বারবার করার কোনো দরকার নেই, রোগের চিকিৎসায়ও কোনো লাভ হয় না। এতেও অযথা অর্থের অপচয় হয়।
পেটের আলট্রাসনোগ্রাম করা হলে অনেক ক্ষেত্রেই পেটে পানি (এসাইটিস) পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু এ ক্ষেত্রেও রোগীর চিকিৎসার কোনো পরিবর্তন হবে না বা অতিরিক্ত কোনো ওষুধ দেওয়া লাগে না। তাই রুটিন হিসেবে পেটের আলট্রাসনোগ্রাম করার কোনো দরকার নেই।
বুকের এক্স-রে করলে বুকের ডান দিকে পানি পাওয়া যেতে পারে। যদি রোগীর শ্বাসকষ্ট থাকে, তবে এক্স-রে করা যেতে পারে। বুকে পানি জমলেও তা বের করার প্রয়োজন সাধারণত হয় না। ডেঙ্গুর চিকিৎসার উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে তা এমনিতেই ভালো হয়ে যায়।
চিকিৎসা বিষয়ে বিভ্রান্তি
ডেঙ্গু যেহেতু ভাইরাসজনিত কারণে হয়, সেহেতু উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসা দেওয়া হয়। যেমন, জ্বর হলে প্যারাসিটামলজাতীয় ওষুধ ও এর সঙ্গে প্রচুর পানি এবং শরবতজাতীয় তরল খাওয়ানোই যথেষ্ট।

রক্ত পরিসঞ্চালনের প্রয়োজনীয়তা আছে কি?
ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার ধরা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক সময় রোগী ও চিকিৎসক উভয়ই রক্ত পরিসঞ্চালনের জন্য ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়েন। অথচ যদি রক্তক্ষরণ না হয় এবং রোগীর রক্তের হিমোগ্লোবিন যদি স্বাভাবিক থাকে, তবে রক্ত পরিসঞ্চালন করার কোনো প্রয়োজন নেই। এ ক্ষেত্রে রক্ত দিলে লাভ তো হবেই না, বরং অন্য কমপ্লিকেশন, এমনকি হার্ট ফেইলিউরও হতে পারে। অনেক সময় দেখা যায়, রক্তের প্লাটিলেট কম হলেই অনেকে রক্ত দিয়ে বসেন। এতে কোনো লাভ হবে না। মনে রাখতে হবে, শুধু কম প্লাটিলেট কাউন্টের জন্য রক্ত দেওয়া উচিত না।

প্লাটিলেট কখন দেব, কখন না?
ডেঙ্গুজ্বরের পাঁচ বা ছয় দিনে রোগের স্বাভাবিকতাতেই প্লাটিলেট কাউন্ট কমতে থাকে, দুই বা তিন দিন পর তা আপনাআপনি বাড়তে শুরু করে কোনো চিকিৎসা ছাড়াই। অনেক সময় প্লাটিলেট কাউন্ট অল্প কমে গেলেই রোগী ও চিকিৎসক খুব চিন্তিত হয়ে পড়েন এবং প্লাটিলেট পরিসঞ্চালনের সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই প্লাটিলেট পরিসঞ্চালনের কোনো প্রয়োজন হয় না। এক ইউনিট প্লাটিলেটের জন্য চার ইউনিট রক্ত প্রয়োজন হয় এবং সেপারেটর দিয়ে আলাদা করতে হয়, যা ব্যয়বহুল। অথচ রক্তে প্লাটিলেটের হাফ লাইফ মাত্র ছয় ঘণ্টা। তাই প্লাটিলেট পরিসঞ্চালনের সুফল হয় অতি স্বল্পমেয়াদি। এ ছাড়া অপ্রয়োজনীয় এবং তাড়াহুড়ো করে প্লাটিলেট দেওয়ায় হেপাটাইটিস-বি অথবা সি, এমনকি এইচআইভি দ্বারা সংক্রামিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। বারবার প্লাটিলেট দিলে রক্তে এর বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি তৈরি হতে পারে। তাই অপ্রয়োজনে প্লাটিলেট দিলে লাভ না হয়ে বরং ক্ষতি হতে পারে। কাজেই প্লাটিলেট দেওয়ার জন্য রোগী ও চিকিৎসকের অযথা ব্যতিব্যস্ত হওয়ার বা চিন্তার কোনো কারণ নেই। এ ছাড়া প্লাটিলেট রিচড প্লাজমা (পিআরপি), প্লাজমা, ডেক্সট্রন ইত্যাদি কিছু নির্দিষ্ট ক্ষেত্রেই দেওয়া যাবে, যেমন—ডেঙ্গু শক সিনড্রোম, ডিআইসি। অযথা এগুলো না দেওয়াই ভালো।

অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া যাবে কি?
যেহেতু ডেঙ্গু ভাইরাসজনিত রোগ, এতে অ্যান্টিবায়োটিকের কোনো ভূমিকা নেই। তবে মনে রাখতে হবে যে ডেঙ্গুর সঙ্গে অন্য ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগও থাকতে পারে। যেমন—টাইফয়েড ফিভার বা অন্য কোনো ইনফেকশন, যার জন্য অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োজন হতে পারে। সে ক্ষেত্রে চিকিৎসক প্রয়োজন মনে করলে অ্যান্টিবায়োটিক দিতে পারেন। অনেকে মনে করেন, ডেঙ্গুতে অ্যান্টিবায়োটিক ক্ষতি করতে পারে এবং তা পরিহার করতে হবে, যা একটি ভুল ধারণা। ডেঙ্গুতে অ্যান্টিবায়োটিক কোনো ক্ষতি করবে না। তবে মাংসে ইনজেকশন দেওয়া যাবে না।

ডেঙ্গুতে স্টেরয়েড ব্যবহার করা যাবে কি?
প্রসঙ্গটি বিতর্কিত, তবে সাধারণ মত হলো ব্যবহার করার বিপক্ষে। অবশ্য কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্টেরয়েডজাতীয় ওষুধ ব্যবহারে ভালো ফল পাওয়া যায়।

ডেঙ্গুর চিকিৎসায় যা মনে রাখা উচিত
 ডেঙ্গু কোনো মারাত্মক রোগ নয় এবং এতে চিন্তার কিছু নেই। রোগী ও রোগীর লোকদের অভয় দেওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
 ডেঙ্গুজ্বর নিজে নিজেই ভালো হয়ে যায়, এমনকি কোনো চিকিৎসা না দিলেও। তবে রোগীকে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়েই চলতে হবে, যাতে কোনো মারাত্মক জটিলতা না হয়।
 ডেঙ্গুরোগে কী কী করা দরকার তা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, কী কী করা যাবে না তা জানাও গুরুত্বপূর্ণ। যা যা করা যায় তা প্রয়োজন অনুযায়ী করতে হবে, অতিরিক্ত করা যাবে না।
 রক্ত বা প্লাটিলেট পরিসঞ্চালন অপরিহার্য—এমনটা মনে করার কোনো কারণ নেই।
ডেঙ্গু মশা ও তার বংশবৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ—দুটোই আমাদের চারপাশে বিদ্যমান। তাই ডেঙ্গুজ্বরকে ঠেকিয়ে রাখা কঠিন। ডেঙ্গু আগেও ছিল, এখনো আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। তাই ডেঙ্গুকে ভয় না পেয়ে ডেঙ্গুজ্বরের সঙ্গে যুদ্ধ করে এবং একে প্রতিরোধ করেই চলতে হবে।

এ বি এম আবদুল্লাহ
ডিন, মেডিসিন অনুষদ
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়।
সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, আগস্ট ১৭, ২০১১

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *