ডিপ্রেশন হলো ইমোশনাল ইলনেস এবং এ রোগে ব্যক্তির মন-মেজাজ বা মুডের অবনতি ঘটে দারুণভাবে। মানসিক রোগের মধ্যে সর্বাধিক কমন রোগ ডিপ্রেশন। এটি এমন এক রোগ যার সাথে জড়িয়ে থাকতে পারে উদ্বিগ্নতা এবং বাধ্যতাধর্মী গোলযোগ। তবে উদ্বিগ্নতা এবং বাধ্যতাধর্মী গোলযোগ আলাদাভাবেও রোগের মাধ্যমে প্রকাশ পেতে পারে। যারা উদ্বিগ্নতায় সচরাচরভাবে ভুগতে থাকে তাদের মাঝেও ডিপ্রেশন অনেক সময় দেখা দেয়। ডিপ্রেশন দেখা দিতে পারে বিভিন্ন মাত্রায়, গভীরতায় ও পরিসরে। এ রোগটি প্রায়ই দীর্ঘমেয়াদি হয়ে থাকে এবং আক্রান্ত ব্যক্তির জীবন দুর্বিষহ ও অর্থহীন করে ফেলে। এ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি ভেঙে পড়েন, অলস হয়ে যান, হয়ে যান অকর্মঠ, নিস্তেজ, শক্তিহীন ও অ্যানার্জিহীন। আমেরিকায় প্রতি ২০ জনে একজন আমেরিকান মারাত্মক ধরনের ডিপ্রেশনে আক্রান্ত।

প্রতি পাঁচজনের মধ্যে একজন তাদের জীবনে কখনো না কখনো ডিপ্রেশনে আক্রান্ত হন। ডিপ্রেশন বিভিন্ন ফর্মে আবির্ভূত হয়ে থাকে। যেমন-অনিদ্রা ব্যক্তির মধ্যে দিনের পর দিন সঙ্ঘটিত হতে থাকে। কারো কারো ডিপ্রেশনের অন্যান্য লক্ষণ বা উপসর্গ নাও থাকতে পারে। ঘুমের সমস্যার মধ্য দিয়ে তার মাঝে ডিপ্রেশনের প্রকাশ ঘটতে পারে। আবার কোনো ব্যক্তি হয়তো ক্লান্তিতে ভুগে থাকতে পারেন। কেউ বা হয়তো উদ্বিগ্নতায় চরমভাবে ভুগতে পারেন কিন্তু তিনি হয়তো বুঝতেও পারেন না যে তার ভোগান্তির পেছনে কাজ করছে মারাত্মক রকমের ডিপ্রেশন নামক মানসিক ব্যাধি। অনেকে অহরহভাবে স্ট্রেসে ভুগে থাকেন। এই স্ট্রেস ব্যক্তির জীবনকে করে তোলে সমস্যাপূর্ণ, কঠিন। স্ট্রেসে আক্রান্ত ব্যক্তি হয়তো কল্পনাও করতে পারেন না, তার স্ট্রেস বা মনোদৈহিক চাপকে পরিচালনা করছে ডিপ্রেশন। অনেক নারী-পুরুষেরই ভোঁতা প্রকৃতির শারীরিক ব্যথা-বেদনার সমস্যা থাকতে পারে­ যার অনেক সময় শারীরিক কোনো কারণ হয়তো খুঁজে পাওয়া যায় না। আসলে এ ধরনের ব্যথা-বেদনা অনেক সময় ডিপ্রেশনজনিত কারণে প্রকাশ পেতে থাকে। ডাক্তারের কাছে ব্যক্তি এমন নানা ধরনের রোগের উপসর্গ বা কষ্টের কথা বলতে পারেন যা অনেক সময় মূল রোগ ডিপ্রেশনকে ঢেকে রাখে। আর এই ঢাকা ব্যাপারটাকে খোলার দায়িত্ব ডাক্তারের। ডাক্তাররা সে দায়িত্ব পালন করে থাকেন।

শিশুদের মধ্যে ২ শতাংশ এবং তরুণ-তরুণীদের মধ্যে প্রায় ৫ শতাংশ ডিপ্রেশনে ভুগে থাকে। ৬৫ বছরের অধিক বয়সের ব্যক্তিরা বলা যায়, এ বয়সের বৃদ্ধ ও বৃদ্ধারা অন্যদের চেয়ে চার গুণ বেশি ডিপ্রেশনে আক্রান্ত হয় বা ভুগে থাকেন।

ডিপ্রেশন একটি জনসাধারণের গুরুত্বপূর্ণ মানসিক স্বাস্খ্য সমস্যা বা Public mental health problem। এ রোগটি যেভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে, এতে মনে হয় ভবিষ্যতে এটা epidemic রূপ নিয়ে নিতে পারে। আর তা ভাবা আশ্চর্যের নয়।

মৃদু বা মাঝারি মাত্রার চেয়েও লক্ষণীয়ভাবে ডিপ্রেশন গভীর রূপ নিতে পারে এবং এটি মানুষের মানসিক ও শারীরিক উৎকর্ষের মাত্রা ও কর্মক্ষমতা কমিয়ে দিতে পিছপা হয় না।

ডিপ্রেশন এমন এক মেন্টাল ডিসঅর্ডার, যার অশুভ থাবায় মানুষের জীবন হয়ে পড়তে পারে ক্ষতবিক্ষত।

বাংলাদেশের মতো দরিদ্র দেশেও এ রোগ অবিশ্বাস্যভাবে বেড়েই চলছে, যা কি না গোটা জনসমাজকে ভাবিয়ে তোলার জন্য যথেষ্ট। আমাদের দেশ কুশিক্ষা ও কুসংস্কারে ভরপুর। এ দেশে মানসিক রোগ যেন অবহেলার বস্তু। এ দেশে মানসিক রোগী মানে তথাকথিত ‘পাগল’। মানসিক রোগকে এ দেশের মানুষ যেন স্বীকারই করতে চায় না। মনোব্যাধি হলে লোকে মনে করেন জিনে ধরেছে, নয়তো পরী ধরেছে অথবা কোনো খারাপ-আত্মা বা ভূত-প্রেত আসর করেছে। এ ধরনের অবৈজ্ঞানিক ও অযৌক্তিক ভাবনা ও চিন্তাধারা রোগীকে করে তোলে অসহায়। আর রোগীর অসহায়ত্বকে আরো মানসিকভাবে করে তোলে বিপর্যস্ত। তবে এখন দিন কিছুটা হলেও পাল্টাতে শুরু করেছে। সাধারণ মানুষ মানসিক রোগের কথা জানতে পারছে এবং কিছুটা হলেও সচেতন হচ্ছে। আমাদের দেশ দরিদ্র হলেও অন্যান্য রোগ-ব্যাধির চিকিৎসার মতো মানসিক রোগেরও চিকিৎসা পাওয়া যাচ্ছে এবং ডিপ্রেশনেরও চিকিৎসা দেয়া সম্ভব হচ্ছে।

বর্তমানে পুরুষদের চেয়ে দ্বিগুণ মহিলা ডিপ্রেশনের চিকিৎসা নিচ্ছেন। তবে এর সঠিক কারণ জানা যাচ্ছে না­ নারীরা ডিপ্রেশনে বেশি আক্রান্ত হন নাকি পুরুষরা ডিপ্রেশনকে আমলে আনছেন না বা চিকিৎসা নিতে রাজি হন না সে কারণে।

উৎসঃ দৈনিক নয়াদিগন্ত, ২৫শে নভেম্বর ২০০৭
লেখকঃ অধ্যাপক ডা. এ এইচ মোহাম্মদ ফিরোজ
পরিচালক, জাতীয় মানসিক স্বাস্খ্য ইনস্টিটিউট, ঢাকা।